Tuesday , November 13 2018
Breaking News

বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক চাকরি

ডিসেম্বরের এক উষ্ণ সকাল। সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের কাছে একটি পরিত্যক্ত অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্রে সমবেত হয়েছে একদল মানুষ। সব শ্রেণী-পেশার মানুষই আছে এই দলে সাবেক ছাত্র, শিক্ষক, সবজি বিক্রেতা, কৃষক। তারা এসেছে সিরিয়ার আলেপ্পো ও ইদলিব শহর থেকে। উদ্দেশ্য : উদ্ধার কার্যক্রমের আরো অগ্রসর পদ্ধতি শিখে নেয়া এবং ফিরে গিয়ে সেগুলো নবনিযুক্ত জরুরি কর্মীদের শেখানো।
এরা হলো সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্সের সদস্য। এই দলটি সিরিয়ায় হোয়াইট হেলমেট (সাদা শিরস্ত্রাণ) নামে পরিচিত। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মত কিছুরই প্রতি পক্ষপাত বা বিদ্বেষ নেই এই নিরস্ত্র দলটির।

ওরা যেখানটাতে সমবেত হয়েছে সেটি একটি জনশূন্য এলাকা। কাছেই মাঠের মধ্যে একটি আগুনে পোড়া বাস এবং জনহীন কয়েকটি পাকা বাড়ি। সবই এদের প্রশিক্ষণের কাজে লাগে। কিন্তু এলাকাটির কী নাম এবং এটি ঠিক কোথায় এসবই জানে না প্রশিক্ষণার্থীরা। তারা শুধু জানে, এলাকার মাটিতে পোঁতা আছে ঘুমন্ত বোমা যেকোনো মুহূর্তে সেগুলোর যেকোনো একটি বা একাধিক জেগে উঠে নিয়ে নিতে পারে যে কারো প্রাণ। আর কাছে-দূরে গুলি ও বোমার শব্দ তো নিজ কানেই শুনতে পায়। ওরা জানে, হোয়াইট হেলমেট দলকে হত্যার হুমকি দিয়ে রেখেছে আইএস নামের জঙ্গি দলটি।

দেখতে দেখতে প্রশিক্ষণ শেষ দিকে চলে এলো। তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। সবাই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যেই খবর এলো, ইদলিব শহরে এক বোমা বিস্ফোরণে ৫০ জনেরও বেশি লোক মারা গেছে। খবরটি শুনে সবার মধ্যে বিষন্নতা নেমে এলো। এই প্রশিক্ষণার্থীদের অনেকেই ওই শহর থেকে এসেছে। নিহতরা তাদের কারো-না-কারো স্বজন তো হবেই।

তা হোক। তবুও জীবন চলবেই। চলবে প্রশিক্ষণও। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে একদিন আগুনে পোড়া বাসটির পাশের পরিত্যক্ত ও ভাঙাচোরা ভবনটিতে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। আর প্রশিক্ষণার্থীদের বলা হলো, এবার ঝাঁপিয়ে পড়ো। তারা গ্যাসমুখোশ পরে, হাতে হোসপাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে কাজে নেমে পড়ার আগে মজা করল। পুরনো দিনের কথাও কিছু বলল। এর ব্যাখ্যা দিলেন খালিদ। ইদলিব থেকে আসা এই মানুষটি চার সন্তানের জনক। তিনি বলেন, এটুকু কথা ও হাসিঠাট্টা আমাদের টেনশন অনেক কমিয়ে দেয়। তবে অনেক কঠিন দৃশ্য আমরা দেখেছি।

কেমন কঠিন দৃশ্য সে বিষয়ে বললেন সামির হুসেইন নামের একজন। বয়স তার আনুমানিক ৩০। বললেন, আলেপ্পোর এক পশুর হাটে একবার বোমা ফাটে। যখন বোমাটি ফাটে, হাট তখন মানুষে বোঝাই। বোমা ফাটার পর মানুষ ও পশুর মাংস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। সেদিন ২৫ জনের মতো মানুষ মারা যায়। আমরা খণ্ডবিখণ্ড হাত, পা, মাথা উদ্ধার করি। অনেককে চিনতেও পারা যায়নি।
প্রশিক্ষণকালে জ্বলন্ত ভবনের ভেতরে ঢুকে যেতে হয় উদ্ধারকর্মীদের। মহড়া শেষে বেরিয়ে এলো তারা। কেউ কেউ সিগারেটে আগুন ধরাল। বলল, আমরা তো সিগারেট ও কফির ওপরই বেঁচে আছি। আসলে কী, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক চাকরিটিই আমরা করছি।
আসলেই তাই। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে পা রেখেছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাবমতে, এই গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত আড়াই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি। আরো কয়েক মিলিয়ন (এক মিলিয়ন=১০ লাখ) মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। ৪০ লক্ষাধিক মানুষ শরণার্থী হয়েছে আশপাশের বিভিন্ন দেশে।

এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে উদ্ধারতৎপরতা চালানোর জন্য গড়ে উঠেছে হোয়াইট হেলমেট দল। এতে কাজ করে দুই হাজার আট শ’ মানুষ। তাদের মধ্যে ৮০ জন নারীও আছেন। সবাইকে সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়। মাসশেষে তারা দেড় শ’ ডলার সম্মানী পায়। হোয়াইট হেলমেটের প্রতিষ্ঠাতা রায়েদ আল-সালেহ জানান, দলের স্বেচ্ছাসেবীরা এ পর্যন্ত ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন।
হোয়াইট হেলমেট যদিও দেশের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেই বেশি কাজ করে থাকে, তবে উদ্ধার কার্যক্রমে তারা কোনোভাবেই পক্ষ-বিপক্ষ বিবেচনা করে না। কারণ তাদের নীতিই হলো, ‘একটা মানুষকে বাঁচানো মানে গোটা মানবজাতিকে বাঁচানো’। তাই তো ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে তারা যেমন উদ্ধার করে প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষে লড়তে আসা হিজবুল্লাহ বা ইরানি যোদ্ধাকে, তেমনি উদ্ধার করে সরকারবিরোধী ফ্রি সিরিয়ান আর্মির গেরিলাদেরও। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা উদ্ধার করে বেসামরিক মানুষজনকে। যেসব এলাকা উভয় পক্ষের লড়াই বা হামলার লক্ষ্যবস্তু, সেসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের কাছে সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্স (আরবিতে দিফআ মিদানি) তাই আশাবাদের প্রতীক। বেঁচে থাকার এবং নিরাপত্তার আশাবাদ।

প্রশ্ন হলো, সিরিয়া নামের দেশটিতে আশাবাদের স্থান কোথায়? যুদ্ধ দেশটির সামাজিক কাঠামো তছনছ করে দিয়েছে। ক’বছর হলো, দেশের সব স্কুল বন্ধ। চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল। ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসে কেউ ভুগে থাকলে তার মৃত্যু বিনাচিকিৎসায় হবে এটা অবধারিত। ‘দেশটিতে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোও বলতে গেলে সেদেশে আসেইনি। এমন অবস্থায় ২০১৩ সালে তৃণমূলপর্যায়ে গঠিত হয় সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্স নামের সংগঠনটি, যা হোয়াইট হেলমেট নামে পরিচিত। ব্রিটেন, ডেনমার্ক ও জাপান এতে তহবিল জোগান দেয়। এর বার্ষিক বাজেট তিন কোটি মার্কিন ডলার। এর বেশির ভাগ অর্থই ব্যয় হেভি ডিগার-এর মতো ভারী সরঞ্জাম কেনায়। আর কিছু অংশ যায় স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মানী বাবদ।

প্রথম দিকে হোয়াইট হেলমেট দলে কিছু বিদেশী উপদেষ্টা কাজ করলেও এখন ওটি শতভাগ সিরিয়ান দিয়ে পরিচালিত। প্রতি মাসেই ২০ থেকে ৩০ জন দলে যোগ দিচ্ছে। উদ্ধারকার্যক্রমে এ পর্যন্ত ১১০ জন হোয়াইট হেলমেট সদস্য মারা গেছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন প্রায় পাঁচ শ’র মতো। স্বেচ্ছাসেবীদের গড় বয়স ২৬। তবে হঠাৎ হঠাৎ অনেক প্রবীণও এতে যোগ দেন। যেমন, একবার ১৭ বছর বয়সী এক স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারতৎপরতা চালাতে গিয়ে মারা যায়। তাকে দাফন করেই তার বাবা চলে আসেন হোয়াইট হেলমেটে যোগ দিতে। সন্তানহারা সেই বাবা এখনো আছেন। ছেলে হারানোর শোক বুকে চেপে তিনি উদ্ধার করে চলেছেন অসংখ্য বিপদগ্রস্ত মানুষকে।

হোয়াইট হেলমেটদের বিপদ শুধু উদ্ধারতৎপরতার সময়েই নয়, স্বাভাবিক সময়েও আসে। আগেই বলা হয়েছে, জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস ওদের হত্যার হুমকি দিয়ে রেখেছে। ওদের কেন্দ্রগুলো যদিও গোপন স্থানে, কিন্তু জঙ্গিরা ওগুলো খুঁজে বের করে ফেলে এবং হামলা করে। ওদের মোটরসাইকেল, এমনকি অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত জঙ্গি হামলা থেকে নিরাপদ নয়। স্বেচ্ছাসেবীরা জানায়, প্রেসিডেন্ট আসাদের সমর্থনে গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রাশিয়ান বিমান হামলা শুরুর পর থেকে জঙ্গিরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তবে যত বিপদ বা বাধাই আসুক, হোয়াইট হেলমেট স্বেচ্ছাসেবীরা সঙ্কল্পে অনড়। স্বেচ্ছাসেবী খালিদ বলেন, দেশের জন্য এই সামান্য কাজটুকুই আমরা করতে পারি। আর এটা তো কোনো চাকরি নয়, এটা আমাদের প্রতি দেশের দাবি। আমরা সেই দাবি মেটাচ্ছি মাত্র।
দলে ঢোকার পর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয় স্বেচ্ছাসেবীদের। এরপর তারা দলের আচরণবিধি মানার শপথ নেয়। শপথ হলো, কখনোই অস্ত্র হাতে না, নিরপেক্ষতার নীতি কঠোরভাবে মেনে চলব এবং কোনো গোত্রপ্রীতি করব না। এরপর সাদা ইউনিফর্ম ও হেলমেট দেয়া হয় স্বেচ্ছাসেবীদের এবং প্রথম মিশনে পাঠানো হয়। ইদলিব থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবী আবদুল খাফি বলেন, আসলে প্রশিক্ষণ ও বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস। বাস্তবে যেভাবে কাজ করতে হয়, প্রশিক্ষণে সেটা পুরোপুরি শেখানো কখনোই সম্ভব হয় না। সবচেয়ে কঠিন বিষয়টি শারীরিক নয়, বরং মানসিক। এত লাশ এবং এত আহত মানুষ ও তাদের কাতর চিৎকার নিজেকে ঠিক রাখাই মুশকিল হয়ে পড়ে। আসলে কাউকে খুন করা সোজা, কঠিন হলো বাঁচানো। কোনো কোনো সময় এই চাপটা আমাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

তবে এত কিছুর মধ্যেও হোয়াইট হেলমেট ছেড়ে কেউ যায় না খুব একটা। একবার একজন শরণার্থী হয়ে জার্মানি চলে যায়। তবে তার চলে যাওয়াটাকে খারাপ চোখে দেখেনি হোয়াইট হেলমেট। জাওয়াদ নামের একজন বলে, ‘আসলে ওর এটা দরকার ছিল। ছোট ছোট দু’টি শিশু আছে ওর। এত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে না থাকাই ভালো। তা ছাড়া আমাদের কাজ হলো যেকোনো মানুষকে যেভাবে হোক, বাঁচানো। জার্মানি গিয়ে ও তো বাঁচল!’

জাওয়াদের এই কথাটিই অন্যভাবে বলেন হোয়াইট হেলমেটের প্রতিষ্ঠাতা সালেহ। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ২০১৫ সালের মার্চ মাসে এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘একটি জীবন বাঁচানো যে কী, তা কোনো ভাষা বা শব্দ দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে এই আনন্দটা আমরা কখনোই পাই না। কেননা, আমরা সর্বক্ষণ হামলার মুখে থাকি।’

সর্বক্ষণ বোমা হামলার মুখে বেঁচে থাকাটা যে কী কষ্টকর, তা জানাতে গত গ্রীষ্মে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদেও বক্তব্য রাখেন সালেহ, যিনি যুদ্ধ শুরুর আগে ছিলেন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির একজন সেলসম্যান।

আসলেই তাই। একবার কোথাও বিমান থেকে বোমা হামলা শুরু হলেই লোকজন পালাতে থাকে। বোমাবর্ষণ বন্ধ হলেও তারা কিন্তু আর ফেরে না। কারণ, তারা ইতোমধ্যে জেনে গেছে যে, কয়েক মিনিট পরই বোমারু বিমানগুলো ফিরে আসবে। রাশিয়ান বিমানের বোমা হামলার কৌশলই এটা। রাশিয়ানরা এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার আগে সবচেয়ে বড় ঘাতক ছিল ব্যারেল বোমা। এতে নানা জিনিসের মধ্যে থাকত ক্লোরিন গ্যাস।

এখন রাশিয়ানদের বোমাবর্ষণ আরো ভয়াবহ। ওসামা (২৯) নামের এক স্বেচ্ছাসেবী বলেন, ‘রুশি বোমা! ওরে বাবা। একেবারে অন্যরকম হামলা।’

রুশ বোমারু বিমানের হামলার চেয়ে ভিন্ন রকম হামলার শিকারও হতে হয় মাঝে মধ্যে হোয়াইট হেলমেটকে। সরকারি ব্লগার এবং রাশিয়ান ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা হরদম বলে চলেছে, হোয়াইট হেলমেট হলো নুসরা ফ্রন্ট (আলকায়েদার সিরিয়ান সহযোগী)। কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিকে দলের এক সদস্যের একটি ছবি পাওয়া যায়, যাতে তার হাতে অস্ত্র রয়েছে। শপথভঙ্গের দায়ে তাকে তখনই দল থেকে বের করে দেয়া হয়।

প্রশিক্ষণ চলাকালেও হোয়াইট হেলমেটরা মজা করে, গান করে কিন্তু একবারের জন্যও ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে কথা বলে না। কারণ, তারা সিরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতোই, যারা চরমপন্থী নয়।

প্রশিক্ষণ পর্বের শেষ দিকের এক রাতেও স্বেচ্ছাসেবীরা প্রচুর সিগারেট পুড়িয়েছে, হাসাহাসি করেছে, বেসুরো গলায় গান গেয়েছে এবং এমনকি আলেপ্পোতে এক বিয়ে অনুষ্ঠানেরও পরিকল্পনা করেছে। ক্রমাগত বোমাবর্ষণ তাদের জীবনকে দোজখে পরিণত করেছে, কিন্তু তারপরও কারো মধ্যেই যুদ্ধজনিত মানসিক বৈকল্যের চিহ্নমাত্র নেই। অথচ তারা জানে, তাদের প্রতিটা মুহূর্তই ঝুঁকিপূর্ণ। হয় মৃত্যুর, নতুবা গুরুতর জখমের।

স্বেচ্ছাসেবী খাফি জানালেন, ইদলিবে তার বাড়ির কাছে সাম্প্রতিক ঘটনা। সেদিন রাশিয়ান বিমান থেকে প্রথমে বেসামরিক এলাকায় বোমা ফেলা হয়। এরপর হোয়াইট হেলমেটের সেন্টারে। কয়েক মিনিটের ১০ স্বেচ্ছাসেবীর সাত জনই গুরুতর আহত।

এরও কয়েক দিন আগের ঘটনা। খাফি ও তার ক’জন সঙ্গী একটি উদ্ধার কার্যক্রমে যাচ্ছিলেন আলেপ্পো শহরের বাইরে। রাশিয়ান বোমারু বিমান এখানে ৪০টি গুচ্ছবোমা ফেলেছে। স্বেচ্ছাসেবীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন, চার দিকে ধোঁয়া, মানুষের হুড়োহুড়ি। তারা বুঝতেই পারছিলেন না কী করবেন। এ সময় কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করে তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে ১০০ ফুট লম্বা একটি টানেল তৈরি করেন। উদ্দেশ্য : ভাঙা বাড়িটিতে আটকে পড়া আট বছর বয়সী একটি মেয়েকে উদ্ধার করা। মেয়েটির কাছাকাছি গিয়ে তার কথা শুনে হতবাক হন খাফি। মেয়েটি বলে, ‘আগে আমার বোনকে বের করুন।’ বলেই মেয়েটি কোনার দিকের একটি কক্ষ দেখিয়ে দেয়। হোয়াইট হেলমেট স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে গিয়ে দেখে, মেয়েটি বেঁচে নেই।

ওসামা নামের এক স্বেচ্ছাসেবী বলেন, আমার সবচেয়ে খারাপ দিনটি গেছে গত বছর অক্টোবরের শেষ দিকে। ওই দিন রাশিয়ান বিমান থেকে একটি মুরগির খামারে বোমা ফেলা হয়। ওই খামারে কিছু শরণার্থী থাকত। খবর পেয়ে আমি একটি ডিগার নিয়ে সেখানে যেতেই আরেকটি কল পাই : ‘রুশ বিমানগুলো আবার আসছে।’ আমি কোনোরকমে আমার গাড়িটাকে একটু দূরে সরিয়ে নিতে পারি। কিন্তু আমার বন্ধুরা তখনো সেখানে। আমি অসহায় চোখে কেবল দেখতে থাকি, জেট বিমানগুলো থেকে বোমা ফেলা হচ্ছে। বিমানগুলো চলে যাওয়ার পর দেখতে পাই, আমার সাথীরা সবাই গুরুতর আহত। চার দিকে নিহতদের লাশ। আহত ও ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়া মানুষের কাতরধ্বনিতে বাতাস ভারী হয়ে আছে।

এ অবস্থাতেই উদ্ধারকাজ শুরু করে হোয়াইট হেলমেট। ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে উদ্ধার করা হয় এক নারী ও তার সাত সন্তানের লাশ। বোমায় তাদের শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে, স্বেচ্ছাসেবীরা নির্ণয় করতেই পারেননি, শিশুরা ছেলে না মেয়ে।

হোসামের অভিজ্ঞতাও কম করুণ নয়। উদ্ধারকাজ চলার সময় ধ্বংসস্তূপের ভেতরে তিনি একটি মাথা দেখতে পেয়ে ভাবেন, ওটা বুঝি পুতুল। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখেন, ওটা একটা শিশুর মাথা। এ সময় এক সন্তানহারা মায়ের রোদনধ্বনি তার হৃদয় বিদীর্ণ করে দেয়। সব সন্তানকে হারিয়ে ওই মা বিলাপ করছিলেন, ‘আমার সোনামানিকরা কোথায়?’

এই তো সিরিয়া। রক্ত-আগুন-অশ্রুতে ভেসে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার এক দেশ। এদেশে কি কখনো শান্তি ফিরবে? স্বেচ্ছাসেবী হোসাম বলে, জানি না। তবে একটা কথা জানি, যদি কখনো শান্তি ফিরে আসে, তবে আমাদের আবার শুরু করতে হবে শূন্য থেকেই।

আমাদেরকে অনুপ্রনিত করতে আপনার সুন্দর একটি মন্তব্যই যথেষ্ঠ

About H.M Mohiuddin

I am a professional web developer and social media marketing expert!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 16 =